ডেস্ক রিপোর্ট :: চলতি বছরের জানুয়ারির শেষাংশে ‘হলুদ চোখ’ নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ইতি। পরীক্ষায় ধরা পড়ে জটিল ‘অটোইমিউন হেপাটাইটিস’, অর্থাৎ তার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিজেরই লিভার কোষগুলোকে ধ্বংস করতে উদ্যত। চিকিৎসা শুরু করার পর দেখা গেল, ওষুধ কাজ তো করছেই না, বরং দেখা যাচ্ছে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এ সময় এগিয়ে এলেন ইতিরই বড় বোন। তার দেয়া লিভার ১১ ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে ইতির শরীরে প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সপ্ল্যান্ট) এক মাস পর সুস্থ হয়ে আজ শনিবার (১ আগস্ট) বাড়ি ফিরেছেন ইতি।

জানা গেছে, গত ৪ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং ট্রান্সপ্ল্যান্ট হেপাটোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমাদের সমন্বয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিম এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাসের পরিচর্যা এবং অস্ত্রোপচার শেষে রোগীর সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার আনন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন ডা. তানভীর নিজে।
‘আজ ইতির ছুটি হবে’ শিরোনামে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে ডা. তানভীর আহমাদ লিখেছেন, ‘ইতির নতুন জীবনের শুরু। ইতির ইতি হচ্ছে না! লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর আজ তার ছুটি হবে। ইতির নিজের ভাষায় বললে— ‘স্যার, আমার চোখ যে কখনোও সাদা হবে, তা আমি চিন্তাও করিনি, ভেবেছি এই হলুদ চোখ নিয়েই বাকী জীবন কাটাবো!’ সেই ইতির আজ ছুটি হচ্ছে, সাদা চোখ নিয়ে।’

তিনি লিখেছেন, ‘এই মেয়েটির সাথে আমার প্রথম দেখা হয় জানুয়ারির শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে। গাঢ় হলুদ বর্ণের চোখ (জন্ডিসের কারণে) নিয়ে ও আমাদের লিভার বিভাগে ভর্তি হয়। সব পরীক্ষা নিরিক্ষার পর জানা যায়, তার অটোইমিউন হেপাটাইটিস রোগটি হয়েছে। যাই হোক ভেবেছি, স্টেরয়েড শুরু করে আস্তে আস্তে এজাথায়োপ্রিন শুরু করব। বিধিবাম! স্টেরয়েড শুরু করার পর জন্ডিস আরও বাড়তে লাগল, এক পর্যায়ে পেটে পানি চলে আসল। বন্ধ করে দেয়া হলো স্টেরয়েড। পেটের পানি কমে আসল। আবার শুরু করা হলো। আবারো একই অবস্থা। আবার বন্ধ করে দিলাম।’
এই চিকিৎসক আরও লিখেছেন, ‘এবার একটু সুস্থ হবার পর, শুরু করা হলো এজাথায়োপ্রিন। জন্ডিস তো কমলোই না, উপহার হিসেবে আমরা পেলাম জ্বর। সব বন্ধ করে দেওয়া হলো। বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে দাড়ালো ২১-এ। সবাই মিলে পরামর্শ করে ঠিক করলাম, এরপর এমএমএফ শুরু করব। খুব অল্প ডোজে শুরু হলো এমএমএফ। না, এবার কোনও সমস্যা হচ্ছে না। ধীরে ধীরে এর ডোজ বাড়ালাম। জন্ডিসের মাত্রা কমা শুরু হলো। না! এবার পেটে পানিও আসল না। একটু একটু করে ডোজ বাড়ালাম। বিলিরুবিন ৬-এ এসে ঠেকল। কিন্তু আইএনআর কমল না।’

এই পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরামর্শ দেন। ডা. তানভীর আহমাদ লিখেছেন, ‘চেয়ারম্যান ও সাবেক ভিসি মহোদয় স্যার রাউন্ডে বললেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্ল্যান করুন। ততদিনে ৩ মাস শেষ। ইতি আমাদের একজন হয়ে উঠেছে, যেন এটাই ওর বাড়ি। ওর বয়স মাত্র ১৮ বা ১৯ হবে। বাবা শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়ল। বলল, আমার কিছুই নেই। চেয়ারম্যান স্যার সাহস দিলেন। বললেন, আমরা তো পাশে আছি। বড় বোন আয়েশা এগিয়ে আসল ওর ছোট বোনকে লিভার দেওয়ার জন্য। বাবা ও ইতি রাজি হলো না। আয়েশার তো বিয়ে হয়নি! পরে যদি বিয়ে না হয়! আমরা বললাম। আমরা ওর বিয়ের ব্যবস্থা করব ইন শা আল্লাহ। শুরু হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুতি। আমরা এগিয়ে যেতে থাকি আমাদের ইতিকে সাথে নিয়ে, হলুদ ইতিকে নিয়ে, যার ধারণাই ছিল তার চোখ আর সাদা হবে না!’
গত ৪ জুলাই সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টানা ১১ ঘণ্টা অবিরাম অস্ত্রোপচার চলে ইতির শরীরে। তার লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হয়। চিকিৎসক আরও লিখেছেন, ‘আইসিইউ আর ওয়ার্ডের দিনগুলো আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা পার করে দিয়ে আজ আমাদের ইতির সাড়ে পাঁচ মাস পর ছুটি হচ্ছে। সাদা চোখ নিয়ে (বিলিরুবিন ০.৭) ও আজ ঘরে ফিরবে। ইতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের আবারো শিখিয়ে দিলেন— হাল ছাড়া যাবে না! আসলে আমাদের লড়াই চলে সরাসরি মৃত্যুর ফেরেশতার সাথে। জানি না, আল্লাহ তায়ালা হয়তো এভাবেই লিখে রেখেছেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে ইতি ভাল হয়ে উঠবে।’

তিনি লিখেছেন, ‘ইতির আজ ছুটি হবে। ওর অনেক প্ল্যান। এটা করবে সেটা করবে। হাসপাতালের স্বয়ংক্রিয় বেডটা ওর অনেক পছন্দ। আমাকে বলল, স্যার আমাকে একটা বেড গিফট করতে পারবেন? আমি বললাম, তোর বিয়ের সময় আমি এরকম একটা বেড উপহার হিসেবে দিব। ও জোড়ে হেসে উঠল। ইতির জীবনের গল্প দুই কাধের ফেরেশতারা আবার নতুন করে লিখবে। মামাদের আবার দায়িত্ব বেড়ে গেল! আমি মনে মনে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।’
ফেসবুক পোস্টে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিমের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন ডা. তানভীর আহমাদ। লিখেছেন, ‘আপনারা ছাড়া এই গল্প কখনোই রচিত হতো না!’
Leave a Reply